কুবি সংবাদদাতাঃ
‘এর চেয়ে বেশি সহ্য করা আমার পক্ষে আর সম্ভব না’—স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলে হাতে লেখা সুইসাইড নোটে এমন কথাই লিখেছেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) ফার্মেসি বিভাগের স্নাতকোত্তর ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ফারজানা ইসলাম। নারায়ণগঞ্জে স্বামীর বাসা থেকে তাঁর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধারের পর সামনে এসেছে ওই চিঠি। এ ঘটনায় ফারজানার স্বামী নাজমুল আলমকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নিয়েছে পুলিশ।
গত শনিবার (২৪ অক্টোবর) রাত ১১টার দিকে নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড এলাকায় স্বামীর বাসা থেকে ফারজানার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
সুইসাইড নোটে ফারজানা তাঁর অস্ত্রোপচারের সময় স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের কাছ থেকে প্রত্যাশিত সহযোগিতা না পাওয়ার অভিযোগ তুলে ধরেন। তিনি লেখেন, ‘তার মায়ের বহির্বিভাগে মাইনর সার্জারি হলে তাকে দেখতে যাওয়া লাগে, আর আমার ২টা মেজর সার্জারি হলো তখন একটা মানুষ কল পর্যন্ত দিলো না।’
স্বামীর আচরণে ক্ষোভ প্রকাশ করে নোটে তিনি আরও লেখেন, ‘উঠতে বসতে খাবারের খোঁটা, আজকে যে আমাকে ফকিন্নি বললো কারণ আমি তার টাকায় খায়, এর চেয়ে বেশি সহ্য করা আমার পক্ষে আর সম্ভব না।’
শাশুড়ির বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে ফারজানা লেখেন, ‘তার মায়ের বিচার যাতে আল্লাহ করে যে দুইদিন পর পর আমার সংসারে ঝামেলা লাগাইছে।’
স্বামীর বড় বোনসহ পরিবারের অন্য সদস্যদের নিয়েও নোটে অভিযোগ করেছেন তিনি। মৃত্যুর পর নিজের মরদেহ কোথায় দাফন করা হবে, সে বিষয়েও স্পষ্ট ইচ্ছার কথা লিখেছেন ফারজানা। নোটে তাঁর ভাষ্য, ‘আমাকে যাতে আমার বাড়িতে দাফন করা হয় এবং নাজমুল আলম যাতে আমার লাশ না ধরে।’
চিঠির শেষাংশে পরিবারের সদস্যদের উদ্দেশে তিনি লেখেন, ‘আম্মু, ভাই, ফয়সাল মাফ করে দিও আমাকে।’
ফারজানার স্বামী নাজমুল আলম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। ফারজানার পরিবারের অভিযোগ, বিয়ের পর থেকে তাঁকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হতো। এ ঘটনায় আগে নারী নির্যাতনের মামলাও করেছিলেন পরিবারের সদস্যরা। পরে পারিবারিক সমঝোতার ভিত্তিতে মামলাটি প্রত্যাহার করা হয় বলে দাবি স্বজনদের।
এ ঘটনায় ফারজানার বাবা রফিকুল ইসলাম নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানায় আত্মহত্যার প্ররোচনার অভিযোগে মামলা করেছেন। মামলায় স্বামী নাজমুল আলমসহ কয়েকজনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
এদিকে নাজমুল আলমের দুলাভাই রাসেল দুই পরিবারের মধ্যে পারিবারিক কলহের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তাঁর ভাষ্য, মঙ্গলবার থেকে ফারজানা ও তাঁর স্বামীর মধ্যে ফোনে ঝগড়া চলছিল। ফারজানার অভিযোগ ছিল, তাঁর অস্ত্রোপচারের সময় স্বামীর পরিবারের কেউ ফোন করেননি। অন্যদিকে, শাশুড়ির অস্ত্রোপচারের সময় ফারজানা কেন ফোন করেননি, তা নিয়েও তাঁদের মধ্যে বিরোধ হয়।
ফতুল্লা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) গাজী সুমন মাহতাব জানান, ঘটনাস্থলে ফারজানাকে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। তাঁর স্বামীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ঘটনাটি আত্মহত্যা বলে মনে হলেও ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ছাড়া মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না।
মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের করা মামলার তদন্ত চলছে। অভিযোগগুলোর সত্যতা এবং মৃত্যুর প্রকৃত কারণ তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।
